লিচু গাছে আমটি আঠা দিয়ে লাগানো হয়েছিল!

ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলায় লিচু গাছে আম ধরা ও তা ছিঁড়ে ফেলা নিয়ে ধোঁয়াশার সৃষ্টি হয়েছে। বিরল এ ঘটনা দেখতে দূরদূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসছিলেন। এরই মাঝে হঠাৎ জানা গেল আমটি রাগের বশে ছিঁড়ে ফেলেছেন স্থানীয় এক সাবেক মেম্বর।

এদিকে আম ছেঁড়ার একদিন পর বুধবার (২১ এপ্রিল) সেই আমের শুকিয়ে যাওয়া বোঁটা ও আঠাজাতীয় পদার্থের উপস্থিতিতে নতুন করে চলছে আলোচনা। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ঠাকুরগাঁও কার্যালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেছেন, ‘বিষয়টি ম্যানুপুলেট করা হয়েছে’। কেউ এটি আঠা দিয়ে লাগাতে পারে বলে জানিয়েছেন তিনি।

জানা গেছে, আমটি ছেঁড়ার পর তার বোঁটা শুকিয়ে গেছে, যা স্বাভাবিকভাবে আম ছিঁড়ে নেওয়ার পরে বোঁটার মতো নয়। সঙ্গে আঠাজাতীয় পদার্থের উপস্থিতিও রয়েছে। আমটি ছিঁড়ে ফেলার পরও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ঠাকুরগাঁও কার্যালয় ওই ঘটনা পর্যবেক্ষণ করেছে।

ঠাকুরগাঁও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আবু হোসেন বলেন, ‘বিষয়টি ম্যানুপুলেট করা হয়েছে, সেটা এখন বোঝা যাচ্ছে। হয়তো এটি কেউ আঠা দিয়ে লাগিয়ে দিয়েছিল। অথবা অন্য কোনো কৌশলে এটি করা হয়েছে’।

তিনি বলেন, ‘লিচুর বোঁটাটি লম্বা হলেও আমেরটি স্বাভাবিকের তুলনায় খুব খাটো। এসব দেখে বিষয়টি খটকা লাগছে প্রথম থেকেই। ছিঁড়ে ফেলার কারণে এখন সেটা বোঝা যাচ্ছে। বোঁটা শুকিয়ে গেছে, যা স্বাভাবিক বোঁটার মতো নয়। বেশ কালচে’।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের এই কর্মকর্তা আরো বলেন, ‘বিষয়টি আমরাও পর্যবেক্ষণে রেখেছিলাম। আমটি রাখতেও হয়েছিল ওই পরিবারকে। কিন্তু সেটা ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে। এ ঘটনা বেশি ছড়িয়ে পড়ছিল বলেই সেটি করা হয়েছে’।

লিচু গাছে আম ধরার ঘটনার কোনো বিজ্ঞানসম্মত ব্যাখ্যা দিতে পারেননি উদ্যানতত্ত্ব বিশেষজ্ঞরা। ফলে এটিকে একটি অলৌকিক ঘটনা মেনে নিয়েছিল অনেকেই। বিষয়টি পর্যবেক্ষণের জন্য কয়েক দিন অপেক্ষার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। কারণ আমটি কোনো কৌশলে লাগানো হলে তা ঝরে পড়বে বা শুকিয়ে যাবে। কৃষি কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন, আমটি যদি বড় হতে থাকে, তখন সেটাকে অস্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে নেওয়া হবে। তখন এটা নিয়ে গবেষণার সুযোগ থাকবে। তবে আমটি ছিঁড়ে ফেলার পর থেকেই স্থানীয়রা এটিকে সাজানো বলে অভিহিত করছেন। তবে যারা নিজের চোখে লিচুর গাছে আম ঝুলতে দেখেছেন তারা বিষয়টি অলৌকিক বলেই ধরে নিয়েছেন।

বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের উদ্যানতত্ত্ব বিভাগের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. রফিকুল ইসলাম জানান, এক গাছে অন্য ফল শুধু গ্রাফটিংয়ের মাধ্যমে সম্ভব। তবে লিচু ও আমের ক্ষেত্রে এটা করা যাবে না। লিচু ও আমের টিস্যু সিস্টেম এক নয়।

তিনি আরো জানান, লিচুর সঙ্গে আমগাছের ডাল জোড়া লেগেছে এমন উদাহরণ নেই। লিচু ও আম এক পরিবারের উদ্ভিদ নয়। ক্রোমোজম সংখ্যা যদি এক হয়, তবে অনেক সময় ঘটতে পারে। সেটাও নয়। উদ্ভিদতত্ত্বে এর কোনো ব্যাখ্যা নেই।

লিচু গাছটির মালিক আবদুর রহমান জানান, কোনো পদ্ধতি নয়, স্বাভাবিকভাবেই সেখানে আম ধরেছে। গত শনিবার সকালে তার নাতি হৃদয় ইসলাম তাকে জানায়, লিচু গাছে একটা আম ধরেছে। তিনি গিয়ে সরেজমিনে তা প্রত্যক্ষ করেন।

এ খবর ছড়িয়ে পড়লে বহু মানুষ এটি দেখতে ভিড় করেন। এরপর লিচু গাছে আমের ছবি গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়। গতকাল মঙ্গলবার এলাকার সাবেক মেম্বার সিকিম লিচু গাছ থেকে আমটি ছিঁড়ে ফেলেছেন বলে অভিযোগ করেন গাছের মালিক আবদুর রহমান।

তবে অভিযুক্ত সাবেক ইউপি সদস্য সিকিম বলেন, ‘এলাকায় একটি লিচু গাছে আম ধরেছে। সেটি দেখার জন্য সারাদিন অনেক দূর থেকে মানুষ আসছে। গাড়ি নিয়েও লোকজন দলে দলে ভিড় করছে। এতে গতকাল আমার ভাতিজা মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আহত হয়েছে। তাই রাগের মাথায় আমটি ছিঁড়ে ফেলেছি। পরে বুঝতে পেরেছি, আমটি ছেঁড়া ঠিক হয়নি’।

ঠাকুরগাঁও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আবু হোসেন বলেন, প্রতিনিধিদল পাঠিয়ে পর্যবেক্ষণ করেছিলাম। দেখে মনে হয়েছে সত্যি লিচু গাছে আম ধরেছে। তবে প্রকৃত ঘটনা জানার জন্য গবেষণার প্রয়োজন ছিল। এর মধ্যে ওপর মহলে যোগাযোগও করেছিলাম। কিন্তু আসল রহস্য আর জানা হলো না। শুনেছি কে বা কারা আমটি ছিঁড়ে ফেলেছে।

About admin

Check Also

লকডাউনে লঞ্চ মালিকদের ৩১০ কোটি টাকার বেশি ক্ষতি

করোনাভাইরাস প্রকোপ রোধে গণপরিবহন বন্ধ থাকায় লঞ্চ মালিকদের ৩১০ কোটি টাকারও বেশি ক্ষতি হয়েছে বলে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *